১০:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রংপুরে একটি পরিবারকে সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখার অভিযোগ

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:২৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
  • ১৪ Time View

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, রংপুর নগরীর দামুদারপুর এলাকার গাবতলী গ্রামে কয়েক মাস ধরে এক ধরনের সামাজিক অবরোধের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। স্থানীয় সমাজপতি ও মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্তে পরিবারটিকে একঘরে ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর থেকেই গ্রামের লোকজন তাদের সঙ্গে সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের।

অভিযোগ রয়েছে, শুধু সামাজিক বয়কটেই থেমে থাকেননি স্থানীয় প্রভাবশালীরা। পরিবারের অসুস্থ শিশুর জন্য গ্রামের দোকান থেকে ওষুধ কিনতেও বাধা দেওয়া হয়েছে। রিকশা বা ভ্যানে উঠতে দেওয়া হয় না, শিশুদের স্কুল, মাদরাসা ও প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথেও সৃষ্টি করা হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। ফলে এক ধরনের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও মানবেতর জীবনযাপনের মধ্যে দিন পার করছে পরিবারটি।

ভুক্তভোগী রোকসানা বেগম বলেন, স্বামী তছলিমের কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বসবাস করে আসছেন তিনি। হঠাৎ করেই স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেন, জায়গাটি মসজিদের সম্পত্তি। এ নিয়ে তার ছেলের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, “আমাদের কোথাও যেতে দেয় না। প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।”

পরিবারটির দাবি, কয়েক দফা শালিস বৈঠকের জন্য ডাকা হলেও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সুষ্ঠু সমাধান না হওয়ায় তারা সেখানে অংশ নেননি। এরপরই তাদের একঘরে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

যে বৈঠকে পরিবারটিকে একঘরে করার সিদ্ধান্ত হয়, সেখানে স্থানীয় সমাজপতিদের মধ্যে আলমগীর হোসেন, মঞ্জু, শহিদুল, মহুলসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

ওয়াজেদ হোসেন বলেন, “একঘরে করার পর থেকে আমার ছোট মেয়ের জন্য গ্রামের কোনো দোকান থেকে ওষুধ কিনতে পারিনি। একদিন মেয়ের জন্য স্যালাইন কিনতে গেলে বাধা দেওয়া হয়। পরে অনেক দূরের কাটাখালী বাজার থেকে ওষুধ আনতে হয়েছে। আমাদের সন্তানদের মক্তব, মাদরাসা ও স্কুলে যেতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিনিয়ত হুমকি-ধমকি শুনতে হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, ঢাকার একটি গার্মেন্টস কারখানায় মাস্টার রোল কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। শুধু তার সন্তানরাই নয়, পরিবারের অন্যান্য ছেলে-মেয়েদেরও স্কুল-কলেজে যাওয়া নিয়ে নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।

অন্যদিকে, গাবতলী গ্রামের মসজিদ কমিটির সভাপতি আলমগীর হোসেন এর সাথে মুঠো ফোনে কথা হলে তিনি জানান একঘরে করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “পরিবারটি গ্রামের এই মসজিদের জায়গায় বসবাস করে আসছে। মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্ত ও নিয়মকানুন মানেনি। তাই মসজিদ কমিটি তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছে। এখানে তাদের কেউ কোনো বাধা প্রদান করেনি বিষয়টি সম্পুর্ন মিথ্যা।

এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একটি পরিবারকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা, শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ মানবিক ও আইনি উভয় দিক থেকেই গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখন স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছে পরিবারটি।

Tag :
About Author Information

রংপুরে একটি পরিবারকে সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখার অভিযোগ

Update Time : ০৬:২৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, রংপুর নগরীর দামুদারপুর এলাকার গাবতলী গ্রামে কয়েক মাস ধরে এক ধরনের সামাজিক অবরোধের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে তাদের। স্থানীয় সমাজপতি ও মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্তে পরিবারটিকে একঘরে ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর থেকেই গ্রামের লোকজন তাদের সঙ্গে সব ধরনের সামাজিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের।

অভিযোগ রয়েছে, শুধু সামাজিক বয়কটেই থেমে থাকেননি স্থানীয় প্রভাবশালীরা। পরিবারের অসুস্থ শিশুর জন্য গ্রামের দোকান থেকে ওষুধ কিনতেও বাধা দেওয়া হয়েছে। রিকশা বা ভ্যানে উঠতে দেওয়া হয় না, শিশুদের স্কুল, মাদরাসা ও প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথেও সৃষ্টি করা হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। ফলে এক ধরনের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও মানবেতর জীবনযাপনের মধ্যে দিন পার করছে পরিবারটি।

ভুক্তভোগী রোকসানা বেগম বলেন, স্বামী তছলিমের কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তিতে দীর্ঘদিন ধরে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বসবাস করে আসছেন তিনি। হঠাৎ করেই স্থানীয় কয়েকজন দাবি করেন, জায়গাটি মসজিদের সম্পত্তি। এ নিয়ে তার ছেলের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, “আমাদের কোথাও যেতে দেয় না। প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি দেখানো হয়। এমনকি বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।”

পরিবারটির দাবি, কয়েক দফা শালিস বৈঠকের জন্য ডাকা হলেও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সুষ্ঠু সমাধান না হওয়ায় তারা সেখানে অংশ নেননি। এরপরই তাদের একঘরে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

যে বৈঠকে পরিবারটিকে একঘরে করার সিদ্ধান্ত হয়, সেখানে স্থানীয় সমাজপতিদের মধ্যে আলমগীর হোসেন, মঞ্জু, শহিদুল, মহুলসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

ওয়াজেদ হোসেন বলেন, “একঘরে করার পর থেকে আমার ছোট মেয়ের জন্য গ্রামের কোনো দোকান থেকে ওষুধ কিনতে পারিনি। একদিন মেয়ের জন্য স্যালাইন কিনতে গেলে বাধা দেওয়া হয়। পরে অনেক দূরের কাটাখালী বাজার থেকে ওষুধ আনতে হয়েছে। আমাদের সন্তানদের মক্তব, মাদরাসা ও স্কুলে যেতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিনিয়ত হুমকি-ধমকি শুনতে হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, ঢাকার একটি গার্মেন্টস কারখানায় মাস্টার রোল কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। শুধু তার সন্তানরাই নয়, পরিবারের অন্যান্য ছেলে-মেয়েদেরও স্কুল-কলেজে যাওয়া নিয়ে নানা বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে।

অন্যদিকে, গাবতলী গ্রামের মসজিদ কমিটির সভাপতি আলমগীর হোসেন এর সাথে মুঠো ফোনে কথা হলে তিনি জানান একঘরে করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, “পরিবারটি গ্রামের এই মসজিদের জায়গায় বসবাস করে আসছে। মসজিদ কমিটির সিদ্ধান্ত ও নিয়মকানুন মানেনি। তাই মসজিদ কমিটি তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছে। এখানে তাদের কেউ কোনো বাধা প্রদান করেনি বিষয়টি সম্পুর্ন মিথ্যা।

এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একটি পরিবারকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখা, শিশুদের শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ মানবিক ও আইনি উভয় দিক থেকেই গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এখন স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছে পরিবারটি।