১০:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিস্তার ভাঙনে হারাচ্ছে ঘর-জমি, তবু থামছে না জীবন

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৪:২৪:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ৯ Time View

তিস্তার ভাঙনে হারাচ্ছে ঘর-জমি, তবু থামছে না জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুরঃ
তিস্তার তীরে একদিকে নতুন চর জেগে উঠছে, অন্যদিকে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে পুরোনো জনপদ। প্রতিবছর বর্ষা এলেই নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি হারাচ্ছে বহু পরিবার। কেউ আশ্রয় নিচ্ছে সরকারি খাসজমিতে, কেউ বাঁধের ওপর অস্থায়ী ঘর তুলে কোনোভাবে দিন কাটাচ্ছে।

নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থায়ী আবাসন ও জীবিকার ব্যবস্থা। ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারানোর পর অনেক পরিবারকে নতুন করে জীবিকা খুঁজতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য স্থায়ী আবাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ভাঙন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নদীভাঙন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। একটি পরিবার যখন ভিটেমাটি হারায়, তখন তারা শুধু ঘর বা জমিই হারায় না; হারিয়ে যায় দীর্ঘদিনের স্মৃতি, সামাজিক অবস্থান, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গড়ে তোলা স্বপ্নও।

তিস্তার ভাঙনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে নদীপারের মানুষকে। এক জায়গায় বসতভিটা হারানোর পর অন্য জায়গায় ঘর তুলে নতুন করে জীবন শুরু করছেন তাঁরা। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে আবারও সেই ঘর নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

ভাঙনের মধ্যেও নতুন স্বপ্ন এত প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে নেই তিস্তাপারের মানুষের জীবন। ঘর হারিয়ে তাঁরা আবার ঘর তুলছেন। জমি হারিয়ে নতুন চরে চাষাবাদের চেষ্টা করছেন। অভাবের মধ্যেও সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে একটি ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন।

দুর্যোগের পর বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর এই চেষ্টা তিস্তাপারের মানুষের জীবনেরই অংশ হয়ে উঠেছে। নদীর সঙ্গে লড়াই করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছেন তাঁরা।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। নদীটির ওপর নির্ভর করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। ফলে তিস্তার ভাঙন শুধু কয়েকটি পরিবারের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙনের ক্ষতি কমাতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে প্রয়োজন সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি টেকসই নদীতীর সংরক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের আবাসন, কর্মসংস্থান, কৃষিঋণ ও শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগও জরুরি।

তা না হলে প্রতিবছর বর্ষায় তিস্তার উত্তাল স্রোতের সঙ্গে নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে থাকবে আরও ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাবে অসংখ্য পরিবারের জীবিকা, স্মৃতি, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

Tag :
About Author Information

তিস্তার ভাঙনে হারাচ্ছে ঘর-জমি, তবু থামছে না জীবন

Update Time : ০৪:২৪:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

তিস্তার ভাঙনে হারাচ্ছে ঘর-জমি, তবু থামছে না জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুরঃ
তিস্তার তীরে একদিকে নতুন চর জেগে উঠছে, অন্যদিকে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে পুরোনো জনপদ। প্রতিবছর বর্ষা এলেই নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি হারাচ্ছে বহু পরিবার। কেউ আশ্রয় নিচ্ছে সরকারি খাসজমিতে, কেউ বাঁধের ওপর অস্থায়ী ঘর তুলে কোনোভাবে দিন কাটাচ্ছে।

নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থায়ী আবাসন ও জীবিকার ব্যবস্থা। ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারানোর পর অনেক পরিবারকে নতুন করে জীবিকা খুঁজতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য স্থায়ী আবাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ভাঙন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, নদীভাঙন শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। একটি পরিবার যখন ভিটেমাটি হারায়, তখন তারা শুধু ঘর বা জমিই হারায় না; হারিয়ে যায় দীর্ঘদিনের স্মৃতি, সামাজিক অবস্থান, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গড়ে তোলা স্বপ্নও।

তিস্তার ভাঙনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে নদীপারের মানুষকে। এক জায়গায় বসতভিটা হারানোর পর অন্য জায়গায় ঘর তুলে নতুন করে জীবন শুরু করছেন তাঁরা। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে আবারও সেই ঘর নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

ভাঙনের মধ্যেও নতুন স্বপ্ন এত প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে নেই তিস্তাপারের মানুষের জীবন। ঘর হারিয়ে তাঁরা আবার ঘর তুলছেন। জমি হারিয়ে নতুন চরে চাষাবাদের চেষ্টা করছেন। অভাবের মধ্যেও সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে একটি ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন।

দুর্যোগের পর বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর এই চেষ্টা তিস্তাপারের মানুষের জীবনেরই অংশ হয়ে উঠেছে। নদীর সঙ্গে লড়াই করেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করছেন তাঁরা।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। নদীটির ওপর নির্ভর করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। ফলে তিস্তার ভাঙন শুধু কয়েকটি পরিবারের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় কৃষি ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীভাঙনের ক্ষতি কমাতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে প্রয়োজন সমন্বিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি টেকসই নদীতীর সংরক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের আবাসন, কর্মসংস্থান, কৃষিঋণ ও শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগও জরুরি।

তা না হলে প্রতিবছর বর্ষায় তিস্তার উত্তাল স্রোতের সঙ্গে নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে থাকবে আরও ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাবে অসংখ্য পরিবারের জীবিকা, স্মৃতি, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।