১০:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রংপুর জেলা স্কুল শিক্ষক সহ চার খুনঃ পুলিশের বক্তব্যে যেসব প্রশ্ন

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৯:১০:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
  • ৮ Time View

রংপুর জেলা স্কুল শিক্ষক সহ চার খুনঃ পুলিশের বক্তব্যে যেসব প্রশ্ন

মিজানুর রহমান মিজান,রংপুর অফিসঃ
রংপুর মেট্রোপলিটন মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে মহানগর পুলিশ। পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই চারজনকে হত্যা করা হয়েছে।

রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ পেয়ে গণপতি ছাদে গেলে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকেও হত্যা করা হয়।

তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে নিহত পরিবারের স্বজনদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
কেন গণপতির বাড়ির ছাদে?

পুলিশ বলছে, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ প্রথমে পাশের একটি বাড়িতে ইয়াবা সেবন করেন। পরে রাতের শেষ দিকে তাঁরা নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান।

প্রশ্ন উঠেছে, ইয়াবা সেবনের জন্য পাশের নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ বা খোলা জায়গা ব্যবহার না করে তাঁরা গণপতির বাড়ির ছাদে গেলেন কেন?

পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

ঘুমন্ত শিশুকে কেন হত্যা?
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার পর তাঁর গোঙানির শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা এগিয়ে আসেন। এরপর তাঁকে হত্যা করা হয়। মায়ের শব্দ শুনে মেয়ে প্রার্থী এগিয়ে এলে তাঁকেও হত্যা করা হয়।
কিন্তু সবশেষে ঘুমিয়ে থাকা প্রিয়মকে কেন হত্যা করা হলো—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

প্রিয়ম যদি ঘুমিয়ে থাকে এবং হত্যাকারীদের দেখতে না পেয়ে থাকে, তাহলে তাকে হত্যার প্রয়োজন কেন হলো—তদন্তে সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুৎ সংযোগ কখন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল?
চারজনের মরদেহ উদ্ধারের সময় বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সংযোগ চালু করে তদন্ত শুরু করেন।
তবে বিদ্যুৎ সংযোগ কখন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল এবং কে তা করেছিলেন, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

হত্যাকাণ্ডের আগে যদি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়ে থাকে, তাহলে এর সঙ্গে হত্যার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।

রাত ২টা ৪০ মিনিটের ফোনকল
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর সঙ্গে বোনের কথা হয়েছিল। এরপর রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতার নম্বর থেকে আবার তাঁকে ফোন করা হয়।
তবে তাঁর মোবাইলের ডাটা বন্ধ থাকায় তিনি সেই কলটি ধরতে পারেননি। পরে কলব্যাক করলেও আর যোগাযোগ হয়নি।

রাত ২টা ৪০ মিনিটে কেন ফোন করা হয়েছিল, কে ফোনটি করেছিলেন এবং তখন প্রীতিলতা জীবিত ছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

গণপতি কেন দরজা বন্ধ করে ঘুমাতেন?
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, অবসরে যাওয়ার কিছুদিন আগে থেকে গণপতি চক্রবর্তী হঠাৎ ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমানো শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ছেলে প্রিয়মও ঘুমাত।

পূজা চক্রবর্তী জানান, তাঁর বোন তাঁকে বলেছিলেন, গণপতি সম্ভবত কোনো কারণে ভয় পাচ্ছিলেন।

তাহলে কী কারণে তিনি ভয় পাচ্ছিলেন—এটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো পূর্বসূত্র ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাড়ি নির্মাণের সময় হুমকি পেয়েছিলেন গণপতি

স্বজনেরা জানিয়েছেন, মাছুয়াপাড়ায় বাড়ি নির্মাণের সময় গণপতি চক্রবর্তী কিছু ব্যক্তির কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিলেন। তবে পরে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে যায় বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

দেশ দিগন্তের প্রতিবেদনে নিহতের স্বজন বিশ্বজিৎ রায়ের বক্তব্যেও পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়টি এসেছে। তাঁর প্রশ্ন, দুই তরুণের পক্ষে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব কি না?

তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন?
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দুজনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে পুরো ঘটনা পরিষ্কার করতে আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

আর চারজনকে হত্যার পর বাড়িটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করা হলো কীভাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হত্যাকাণ্ডের পুরো চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। তদন্ত এখনো চলমান। তাই পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের আলামত, মুঠোফোনের তথ্য, ফরেনসিক প্রতিবেদন ও আসামিদের জবানবন্দি মিলিয়ে প্রকৃত ঘটনা বের করা জরুরি।

কেন তাঁরা গণপতির বাড়ির ছাদে গেলেন?
ঘুমন্ত প্রিয়মকে কেন হত্যা করা হলো?
বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ কে বিচ্ছিন্ন করেছিল?
রাত ২টা ৪০ মিনিটের ফোনকলের রহস্য কী?
গণপতি আগে যে হুমকির কথা জানিয়েছিলেন, তার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না?

 

Tag :
About Author Information

রংপুর জেলা স্কুল শিক্ষক সহ চার খুনঃ পুলিশের বক্তব্যে যেসব প্রশ্ন

Update Time : ০৯:১০:৫৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬

রংপুর জেলা স্কুল শিক্ষক সহ চার খুনঃ পুলিশের বক্তব্যে যেসব প্রশ্ন

মিজানুর রহমান মিজান,রংপুর অফিসঃ
রংপুর মেট্রোপলিটন মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যার ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে মহানগর পুলিশ। পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ওই চারজনকে হত্যা করা হয়েছে।

রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে গিয়ে ইয়াবা সেবন করছিলেন। শব্দ পেয়ে গণপতি ছাদে গেলে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী ও ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীকেও হত্যা করা হয়।

তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে নিহত পরিবারের স্বজনদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
কেন গণপতির বাড়ির ছাদে?

পুলিশ বলছে, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ প্রথমে পাশের একটি বাড়িতে ইয়াবা সেবন করেন। পরে রাতের শেষ দিকে তাঁরা নির্মাণাধীন একটি ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান।

প্রশ্ন উঠেছে, ইয়াবা সেবনের জন্য পাশের নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ বা খোলা জায়গা ব্যবহার না করে তাঁরা গণপতির বাড়ির ছাদে গেলেন কেন?

পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

ঘুমন্ত শিশুকে কেন হত্যা?
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার পর তাঁর গোঙানির শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা এগিয়ে আসেন। এরপর তাঁকে হত্যা করা হয়। মায়ের শব্দ শুনে মেয়ে প্রার্থী এগিয়ে এলে তাঁকেও হত্যা করা হয়।
কিন্তু সবশেষে ঘুমিয়ে থাকা প্রিয়মকে কেন হত্যা করা হলো—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

প্রিয়ম যদি ঘুমিয়ে থাকে এবং হত্যাকারীদের দেখতে না পেয়ে থাকে, তাহলে তাকে হত্যার প্রয়োজন কেন হলো—তদন্তে সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

বিদ্যুৎ সংযোগ কখন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল?
চারজনের মরদেহ উদ্ধারের সময় বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সংযোগ চালু করে তদন্ত শুরু করেন।
তবে বিদ্যুৎ সংযোগ কখন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল এবং কে তা করেছিলেন, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

হত্যাকাণ্ডের আগে যদি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়ে থাকে, তাহলে এর সঙ্গে হত্যার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।

রাত ২টা ৪০ মিনিটের ফোনকল
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর সঙ্গে বোনের কথা হয়েছিল। এরপর রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতার নম্বর থেকে আবার তাঁকে ফোন করা হয়।
তবে তাঁর মোবাইলের ডাটা বন্ধ থাকায় তিনি সেই কলটি ধরতে পারেননি। পরে কলব্যাক করলেও আর যোগাযোগ হয়নি।

রাত ২টা ৪০ মিনিটে কেন ফোন করা হয়েছিল, কে ফোনটি করেছিলেন এবং তখন প্রীতিলতা জীবিত ছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

গণপতি কেন দরজা বন্ধ করে ঘুমাতেন?
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, অবসরে যাওয়ার কিছুদিন আগে থেকে গণপতি চক্রবর্তী হঠাৎ ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমানো শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ছেলে প্রিয়মও ঘুমাত।

পূজা চক্রবর্তী জানান, তাঁর বোন তাঁকে বলেছিলেন, গণপতি সম্ভবত কোনো কারণে ভয় পাচ্ছিলেন।

তাহলে কী কারণে তিনি ভয় পাচ্ছিলেন—এটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো পূর্বসূত্র ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বাড়ি নির্মাণের সময় হুমকি পেয়েছিলেন গণপতি

স্বজনেরা জানিয়েছেন, মাছুয়াপাড়ায় বাড়ি নির্মাণের সময় গণপতি চক্রবর্তী কিছু ব্যক্তির কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিলেন। তবে পরে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে যায় বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

দেশ দিগন্তের প্রতিবেদনে নিহতের স্বজন বিশ্বজিৎ রায়ের বক্তব্যেও পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়টি এসেছে। তাঁর প্রশ্ন, দুই তরুণের পক্ষে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব কি না?

তদন্তে এখন মূল প্রশ্ন?
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দুজনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে পুরো ঘটনা পরিষ্কার করতে আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।

আর চারজনকে হত্যার পর বাড়িটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করা হলো কীভাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই হত্যাকাণ্ডের পুরো চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। তদন্ত এখনো চলমান। তাই পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের আলামত, মুঠোফোনের তথ্য, ফরেনসিক প্রতিবেদন ও আসামিদের জবানবন্দি মিলিয়ে প্রকৃত ঘটনা বের করা জরুরি।

কেন তাঁরা গণপতির বাড়ির ছাদে গেলেন?
ঘুমন্ত প্রিয়মকে কেন হত্যা করা হলো?
বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ কে বিচ্ছিন্ন করেছিল?
রাত ২টা ৪০ মিনিটের ফোনকলের রহস্য কী?
গণপতি আগে যে হুমকির কথা জানিয়েছিলেন, তার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না?